বিশ্বজিত রায়::
সুনামগঞ্জ-১ আসনে হাওরবন্ধু থেকে ‘মেম্বার অব পার্লামেন্ট’ হয়েছেন কামরুজ্জামান কামরুল। বিএনপি প্রথমে মনোনয়ন না দিলেও জনসমর্থনের জোরে বিকল্প মনোনয়নের পর চূড়ান্ত প্রার্থী করা হয় তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৮০৮ ভোট বেশি পেয়ে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে হাওরবাসীর প্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছেন তিনি। বিজয়ী কামরুলের মাঝে ভাটির আগামী নেতৃত্ব তৈরির সম্ভাবনা দেখছেন কেউ কেউ।
সুনামগঞ্জ সুশাসনের জন্য নাগরিক (সনাক) এর সদস্য দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী বলেন, হাওরডুবির ঘটনায় বাঁধে কাজ করা কিংবা কৃষক-জেলেসহ খেটে খাওয়া মানুষের যৌক্তিক দাবির পক্ষে সর্বদা সোচ্চার তিনি। তৎকালীন সরকারবিরোধী আন্দোলনেও মাঠ ছাড়েননি। জনহিতকর অতীত কর্মপন্থা অনুসরণের মাধ্যমে ভাটির গুণমুগ্ধ প্রয়াত নেতৃবৃন্দের পাশে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা আছে তাঁর মাঝে।
জানা যায়, জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল হয়ে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হন কামরুল। গণমুখী আন্দোলনে নেতৃত্বদানের ফলস্বরূপ ২০১৪ সালে তাহিরপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালে দলীয় সিদ্ধান্তে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। দলের দুর্দিনে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছেন। অবশেষে সুনামগঞ্জ-১ আসনে কেন্দ্রীয় কৃষক দলের যুগ্ম সম্পাদক আনিসুল হক প্রাথমিক মনোনয়ন পাওয়ার পর জনপ্রিয়তার মানদ-ে চূড়ান্ত মনোনয়ন পেয়ে ধানের শীষ প্রতীকে সংসদ সদস্য হয়েছেন কামরুল।
হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ-১ (জামালগঞ্জ-তাহিরপুর-ধর্মপাশা-মধ্যনগর) আসনে দেশের দ্বিতীয় রামসার সাইট টাঙ্গুয়া ছাড়াও ছোট-বড় প্রায় ২৫টি হাওর আছে। এ হাওরগুলোই সুনামগঞ্জের প্রাণ ‘মাছ আর ধান’ উৎপাদনের উর্বর ক্ষেত্র। এছাড়া আছে বালু-পাথরসমৃদ্ধ নদী যাদুকাটা, শুল্ক স্টেশন, শহীদ সিরাজ লেক, শাহ আরেফিন (র.)-এর আস্তানা, অদ্বৈত মহাপ্রভুর মন্দির (পণাতীর্থ), শিমুল বাগানসহ একাধিক দর্শনীয় স্থান। সম্পদশালী এ আসন থেকে নির্বাচন করেছেন কমরেড প্রসূন কান্তি রায় বরুণ, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, নজির হোসেনের মতো বরেণ্য রাজনীতিবিদেরা। তাঁদের মধ্যে নজির হোসেন এখানে ১৯৯১ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পাঁচবার নির্বাচন করেছেন। এর মাঝে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থী হয়ে ‘অনন্য নজির’ গড়েছিলেন তিনি। সেবার আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী বিদগ্ধ পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চেয়ে ৩২ হাজার ৮৭৪ ভোট বেশি পেয়ে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন নজির হোসেন। তাঁর শিষ্যত্ব স্বীকার করা কামরুজ্জামান কামরুল ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের রাজনীতিতে বিজয়ী হয়ে দীক্ষাগুরুর কাতারে নাম লিখিয়েছেন। নবনির্বাচিত কামরুলের মাঝে প্রয়াত বরুণ-সুরঞ্জিত-নজিরের ছায়া দেখছেন রাজনীতি সচেতন মানুষেরা।
কমরেড বরুণ রায় স্মৃতি পরিষদের সভাপতি বিদ্যুৎ জ্যোতি চক্রবর্তী বলেন, নেতার নেতৃত্ব ফুটে উঠে জনবান্ধব কাজে। গেল নির্বাচনে সাধারণ মানুষ এমন একজনকেই (কামরুল) বেছে নিয়েছেন। তাকে নির্বাচিত করার মাধ্যমে হাওরবাসী হয়তো আগামীর নেতৃত্ব পেয়ে গেছে।
তথ্য তালাশে জানা যায়, সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে একসময় জলমহাল ইজারার নামে সাধারণ কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়ের মানুষ দমন-পীড়নের শিকার হতেন। ২০০০ সালে একাধিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে তাহিরপুরের টাঙ্গুয়ার হাওর এলাকায় গণআন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন-সংগ্রামের পর ২০০৩ সালে জলমহাল নিয়ন্ত্রণকারী ‘ওয়াটার লর্ড’ প্রভাব বিলুপ্তির মধ্য দিয়ে ইজারামুক্ত দাবি পূরণ হয় স্থানীয়দের। কামরুল সেই ‘ওয়াটার লর্ড’ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের একজন বলে জানা গেছে।
এছাড়া ২০১৭ সালের মার্চের শেষে অকাল বন্যায় সুনামগঞ্জের একাধিক হাওরের বেড়িবাঁধ ভাঙার উপক্রম হলে, শনির হাওরের বিপজ্জনক আহাম্মকখালী ও লালুরগোয়ালা বাঁধ রক্ষায় কৃষক-শ্রমিক-জনতার সাথে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেছেন তৎকালীন তাহিরপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান কামরুল। ওই দুর্যোগপূর্ণ সময়ে চাপের মুখে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও একশ্রেণির দুর্নীতিবাজ জনপ্রতিনিধি গা ঢাকা দিলেও কামরুল ছিলেন কৃষক-জনতার সঙ্গী। অনেকের ধারণা, তাঁর বিজয়ের ক্ষেত্রে এসব ইতিবাচক কর্মকান্ড ভূমিকা রেখেছে। কামরুজ্জামান কামরুল সম্পর্কে মূল্যায়ন করতে গিয়ে ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসনিক কর্মকর্তা অজিত রায় বলেন, ২০১৭ সালে হাওর বিপর্যয়ের সময় কৃষক-জনতাকে নিয়ে কাজ করা ওই মানুষটাকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেদিন বাঁধ রক্ষায় তাঁর নিরলস প্রচেষ্টা প্রশংসা কুড়িয়েছিল।
কামরুল সুনামগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্যে মিশে থাকা বিদগ্ধ নেতৃবৃন্দের প্রতিচ্ছবি উল্লেখ করে তিনি বলেন, একেকজন নেতার একেকটি গুণ সংগ্রহ করে তিনি সমষ্টিতে রূপান্তরিত হয়েছেন। আমার মনে হয়, হাওরের সমস্যা-সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব পেল হাওরবাসী। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-১ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে কামরুজ্জামান কামরুল পেয়েছেন ১ লাখ ৬১ হাজার ৭৭৪ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী তোফায়েল আহমদ খান পেয়েছেন ৯২ হাজার ৯৬৬ ভোট। ১৭৮টি কেন্দ্রে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন ৫১ দশমিক ০৩ ভাগ ভোটার।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল এ প্রতিবেদককে বলেন, অনেক প্রত্যাশা ও স্বপ্ন নিয়ে মানুষ আমাকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচিত করেছেন। জনপ্রত্যাশা ও স্বপ্ন পূরণের মাঝে আমি বেঁচে থাকতে চাই।
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
হাওরবন্ধু থেকে সংসদ সদস্য
কামরুজ্জামান কামরুল নেতৃত্বের সম্ভাবনাময় প্রতিচ্ছবি
- আপলোড সময় : ২৪-০২-২০২৬ ১২:১৬:১৩ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ২৪-০২-২০২৬ ১২:১৯:১৭ পূর্বাহ্ন
সুনামগঞ্জ-১ সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল।
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ